চার্বাক দর্শন

চার্বাক দর্শন

অমরনাথ ভট্টাচার্য

চার্বাক দর্শন : এক প্রকার অনৈশ্বরিক বা নাস্তিক দর্শন।

চার্বাকপন্থিরা জগতের কর্তা হিসেবে কোনো চেতন-সর্বজ্ঞ ঈশ্বরকে স্বীকার করেন না। তাঁরা জড়বাদে বিশ্বাসী।

দার্শনিক সমস্যার সমাধানে স্বাধীন যুক্তি কীভাবে সহায়তা করে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় জড়বাদে। বৃহস্পতি এ দর্শনের আদি প্রবক্তা বলে স্বীকৃত।

‘চারু’ বা ‘বৃহস্পতি’ প্রবর্তিত দর্শন বলে একে ‘চার্বাক’ বা ‘বার্হস্পত্য’ বলে। বার্হস্পত্যসূত্র চার্বাকগণের মূল গ্রন্থ। চার্বাকদর্শনকে ‘লোকায়ত দর্শন’ও বলা হয়, যেহেতু তা কেবল ইহলোকেরই অস্তিত্ব স্বীকার করে।

চার্বাকরা প্রাকৃতজনের মতো ব্যবহার করে বলে তাদেরকে লোকায়ত বা লোকায়তিকও বলা হয়।

চার্বাকমত অতি প্রাচীন

চার্বাকমত অতি প্রাচীন। ভারতীয় দর্শনের সকল সম্প্রদায়ই তাদের গ্রন্থে চার্বাকের মত পূর্বপক্ষরূপে উপস্থাপন করেছে।

এসব গ্রন্থ থেকেই চার্বাকমতের পরিচয় পাওয়া যায়।

ঋগ্বেদ (১০.৭২), ছান্দোগ্যোপনিষৎ (৮.৭-৯), মহাভারত (শান্তিপর্ব, শল্যপর্ব), মাধবাচার্যের সর্বদর্শনসংগ্রহ (১ম অধ্যায়), বাৎস্যায়নের ন্যায়ভাষ্য (২.১.৩৭; ৩.২.৩৫), শঙ্করের শারীরকভাষ্য (১.১.১; ২.২.২), বাচস্পতির ভামতী (৩.৩.৫৩) প্রভৃতি আকর গ্রন্থে পূর্বপক্ষরূপে চার্বাকমত বিধৃত আছে।

চরমপন্থি চার্বাক

চরমপন্থি চার্বাকরা বলেন, প্রত্যক্ষই জ্ঞানের একমাত্র উৎস। তাঁরা অনুমানের প্রামাণ্য মানেন না, কারণ সাধ্য ও হেতুর ব্যাপ্তি নির্ণয়যোগ্য নয়।

তাঁরা শাস্ত্রবাক্যের প্রামাণ্য সযুক্তিক খণ্ডন করেন—যা প্রত্যক্ষযোগ্য নয়, তার অস্তিত্ব নেই। পরলোক, পাপ ও পুণ্য বলে কিছু নেই, যেহেতু এগুলি প্রত্যক্ষযোগ্য নয়।

চার্বাকগণ স্বভাববাদী, হেতুবাদী নন। তাঁদের মতে উৎপত্তির জন্য কার্য পূর্ববর্তী কোনো কারণের অপেক্ষা করে না। উৎপত্তি হওয়াই কার্যের স্বভাব।

কিন্তু শিক্ষিত চার্বাকগণ বলেন, স্বভাব হতে কার্য উৎপন্ন হয় (তত্ত্বসংগ্রহ)।

তাঁদের স্বভাববাদ বস্ত্তত হেতুবাদের নামান্তর (ন্যায়কুসুমাঞ্জলি ১/৫)। শিক্ষিত চার্বাকগণ প্রত্যক্ষ ও অনুমান উভয়েরই প্রামাণ্য স্বীকার করেন।

ভূতচতুষ্টয়বাদী

চার্বাকগণ ভূতচতুষ্টয়বাদী। তাঁরা ক্ষিতি, জল, তেজ ও বায়ু এ চার প্রকার মৌলিক পদার্থ স্বীকার করেন। এ কটি ভূত পদার্থ থেকেই যাবতীয় ভৌতিক পদার্থ উৎপন্ন হয়। শরীর, ইন্দ্রিয় ও বাহ্য বিষয় চার প্রকার মৌলিক পদার্থের সমুদয় মাত্র।

তাঁরা ভূতচৈতন্যবাদ প্রবর্তন করেন। জড় থেকে চৈতন্যের পৃথক সত্তা নেই। তাঁরা বলেন, চারটি ভূত পদার্থের সংমিশ্রণে দেহে চৈতন্য জন্মায়; যেমন, কিণ্বাদির সংমিশ্রণে মাদকতা শক্তি জন্মায়। সুতরাং চৈতন্যবিশিষ্ট দেহই আত্মা (দেহাত্মবাদ)।

স্থূল শরীরটাই জীবের সর্বস্ব; তার তুষ্টি ও পুষ্টি বিধান করেই সে কৃতার্থ হয়।

অন্য এক শ্রেণীর চার্বাক ইন্দ্রিয়কে (ইন্দ্রিয়াত্মবাদ), কেউ প্রাণকে (প্রাণাত্মবাদ) ও অপর শ্রেণী মনকে (মন-আত্মবাদ) আত্মা বলেন।

চার্বাক মত

চার্বাক মতে ইন্দ্রিয়জ সুখই মানুষের জীবনে একমাত্র কাম্য। পার্থিব দুঃখই নরক। দেহের উচ্ছেদই হচ্ছে মুক্তি। মৃত্যুতেই সব কিছুর সমাপ্তি ঘটে। মৃত্যুর পর শরীর ও চৈতন্য কোনোটিই থাকে না।

চার্বাকগণ মানুষের দৃষ্টি অসীম থেকে সসীমের দিকে, আধ্যাত্মিকতা থেকে বাস্তবের দিকে আকৃষ্ট করতে প্রয়াসী। পরম আনন্দে জীবন উপভোগ করার জন্য তাঁরা সকলকে উপদেশ দেন।

সূত্র : বাংলাপিডিয়া

ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন : Charvaka Philosophy

Share us

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *